300 Year Old Durga Puja: ইছামতীর তীরে ৩০০ বছরের ঐতিহ্য! টাকির পুবের বাড়ির দুর্গাপুজোয় আজও বেঁচে অবিভক্ত বাংলার স্মৃতি

টাকির পুবের বাড়ির দুর্গাপুজোয় ইতিহাস ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধন

উত্তর ২৪ পরগনার টাকি শহর শুধু ইছামতী নদীর সৌন্দর্য কিংবা ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের জন্যই পরিচিত নয়। এই শহরের বুকে ছড়িয়ে রয়েছে বহু প্রাচীন ইতিহাস, পারিবারিক ঐতিহ্য এবং সাংস্কৃতিক স্মৃতি। তারই এক উজ্জ্বল নিদর্শন রায়চৌধুরী পরিবারের পুবের বাড়ির প্রায় ৩০০ বছরের পুরনো দুর্গাপুজো।

পুরনো স্থাপত্য, ঐতিহ্যবাহী ঠাকুরদালান এবং অতীতের নানা স্মৃতিকে ঘিরে আজও বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করে এই বাড়ি। একসময়ের জমিদারি সংস্কৃতির পরিচয় বহনকারী এই প্রাঙ্গণ দুর্গাপুজোর সময় উৎসবের আবহে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। শুধু স্থানীয় বাসিন্দারাই নন, দূরদূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীদের কাছেও এই পুজো বিশেষ আগ্রহের বিষয়।

ঠাকুরদালানে অতীতের ছোঁয়া

পুবের বাড়ির পুরনো দালান, কোঠা এবং প্রাচীন বটগাছ যেন সময়ের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। বাড়ির ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বিভিন্ন লোককথা ও সাংস্কৃতিক স্মৃতি। ‘রাজা-রানী’ উপন্যাসের সঙ্গে এই বাড়ির নামের সম্পর্ক থাকায় সাহিত্যপ্রেমীদের কাছেও স্থানটি আকর্ষণীয়।

সময়ের পরিবর্তনে জমিদারি ব্যবস্থার অবসান ঘটেছে। বদলেছে সামাজিক জীবনযাত্রাও। কিন্তু পরিবারের দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ঐতিহ্য এখনও ধরে রেখেছেন বর্তমান প্রজন্মের সদস্যরা।

পুজোর আঙিনায় সংস্কৃতির আসর

একসময় নবমীতে মহিষবলির প্রথা প্রচলিত থাকলেও বর্তমানে সেই রীতি বন্ধ। এখন পুজোর দিনগুলিতে ঠাকুরদালান ঘিরে নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। নাচ, গান, আবৃত্তি এবং অন্যান্য পরিবেশনা দেখতে ভিড় করেন বহু মানুষ। ফলে পারিবারিক পুজো ছাড়িয়ে এই উৎসব স্থানীয় সংস্কৃতি ও সামাজিক মিলনক্ষেত্রের রূপ নিয়েছে।

টাকি পুরসভার চেয়ারম্যান সোমনাথ মুখোপাধ্যায়ের বক্তব্য অনুযায়ী, এই পুজো দেখতে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলা এবং ভিনরাজ্য থেকেও দর্শনার্থীরা আসেন। সীমান্তের ওপার থেকেও এই ঐতিহ্যবাহী পুজোর প্রতি মানুষের আগ্রহ রয়েছে বলে তিনি জানান।

স্থানীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী, পুবের বাড়ির প্রতিমা ইছামতীতে নিরঞ্জন না হওয়া পর্যন্ত অন্যান্য বাড়ি ও বারোয়ারির প্রতিমার বিসর্জন শুরু হয় না। এই রীতি পুজোটির বিশেষ পরিচিতির অন্যতম অংশ।

মহালয়া থেকেই শুরু প্রস্তুতি

রাজপরিবারের বর্তমান সদস্য শর্মিষ্ঠা ঘোষ জানান, মহালয়ার আগেই পুজোর প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। মহালয়ার দিন ঘটপুজোর মাধ্যমে সূচনা হয় আরাধনার। এরপর প্রতিপদ থেকে নির্দিষ্ট রীতি মেনে চলে দেবীর পুজো।

বিসর্জনের দিনও রয়েছে পরিবারের নিজস্ব প্রথা। ঐতিহ্য মেনে পান্তা ভাত ও কচুশাক খাওয়ার রীতি আজও পালিত হয়। এরপর কাঁধে বহন করে শোভাযাত্রার মাধ্যমে প্রতিমাকে নিয়ে যাওয়া হয় ইছামতী নদীর তীরে।

পুজো শেষেও থাকে দেবীদর্শনের সুযোগ

দুর্গাপুজোর কয়েকটি দিনের মধ্যেই পুবের বাড়ির ঐতিহ্য সীমাবদ্ধ নয়। সারা বছরই এই বাড়ির ঠাকুরদালানে প্রতীকী দেবীর উপস্থিতি বজায় রাখা হয়, যাতে বিভিন্ন স্থান থেকে আসা পর্যটকেরা দেবীদর্শনের পাশাপাশি বাড়িটির ইতিহাস ও স্থাপত্য সম্পর্কে জানার সুযোগ পান।

ইছামতীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা পুবের বাড়ি আজও মনে করিয়ে দেয় বাংলার অতীতের কথা। প্রায় তিন শতাব্দীর দুর্গাপুজো, পারিবারিক রীতিনীতি, সাংস্কৃতিক আয়োজন এবং দুই বাংলার মানুষের আবেগ—সব মিলিয়ে এই ঐতিহ্যবাহী বাড়ি টাকির ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক উল্লেখযোগ্য নিদর্শন হয়ে রয়েছে।

Exit mobile version