দুর্গাপুজো মানেই শুধু আলোকসজ্জা, মণ্ডপসজ্জা কিংবা প্রতিমার বৈচিত্র্য নয়—পুজো হতে পারে সমাজকে নতুন করে ভাবার এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। সেই ভাবনাকেই সামনে রেখে এবছর এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে সোদপুর পূর্বপল্লী সর্বজনীন দুর্গোৎসব কমিটি। পুজোর সুবর্ণজয়ন্তী বর্ষে তাদের বিশেষ ভাবনা—‘আমরা মানুষ’। এই উদ্যোগের কেন্দ্রে রয়েছেন শিল্পী ও সমাজকর্মী ইন্দ্রজিৎ পোদ্দার এবং তাঁর সঙ্গে কাজ করা এইচআইভি পজিটিভ শিশু-কিশোর ও সহযোগীরা।
দীর্ঘদিন ধরে সাবেকি রীতিতে দুর্গাপুজোর আয়োজন করে আসছে পূর্বপল্লী। কিন্তু পুজোর ৫০তম বছরে এসে উদ্যোক্তারা বেছে নিয়েছেন এক নতুন পথ। এবার মণ্ডপের বিশেষত্ব শুধু শিল্পকর্মে নয়, বরং তার অন্তর্নিহিত সামাজিক বার্তায়। সমাজের একাংশের অবহেলা, ভয় এবং বৈষম্যের শিকার মানুষদের মূলস্রোতে নিয়ে আসার ভাবনাই এই পুজোর অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।
বাণীপুরের শিল্পী ইন্দ্রজিৎ পোদ্দার এর আগেও বিভিন্ন ধরনের উপকরণ ব্যবহার করে নিজের শিল্পভাবনার পরিচয় দিয়েছেন। ভাস্কর্য ও মণ্ডপসজ্জায় তাঁর কাজ দর্শকদের আকর্ষণ করেছে। তবে এবারের উদ্যোগে শিল্পসৃষ্টির পাশাপাশি গুরুত্ব পাচ্ছে সামাজিক সচেতনতা। তাঁর সহযোগী এইচআইভি পজিটিভ ছেলেমেয়েদের সঙ্গে নিয়ে পুজোর বিভিন্ন কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
উদ্যোক্তাদের কাছে এই প্রস্তাব ছিল এক নতুন অভিজ্ঞতা। শিল্পী যখন জানান, তাঁর সঙ্গে এইচআইভি আক্রান্ত ছেলেমেয়েরাও পুজোর কাজে সক্রিয়ভাবে অংশ নেবে, তখন ক্লাব কর্তৃপক্ষ ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে সেই প্রস্তাবে সম্মতি জানান। পারস্পরিক সহযোগিতা ও উৎসাহের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছে প্রস্তুতি। এর মাধ্যমে স্পষ্ট করে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে, এইচআইভি আক্রান্ত হওয়া কোনও মানুষের পরিচয়ের একমাত্র সংজ্ঞা নয়। তাঁরাও অন্য সবার মতো সমান মর্যাদা, ভালোবাসা ও সম্মানের অধিকারী।
এই পুজোর আরও একটি উল্লেখযোগ্য দিক হল কুমারীপুজো। উদ্যোক্তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এবারের কুমারীপুজোয় কুমারী হিসেবে পূজিত হবে এইচআইভি পজিটিভ একটি শিশুকন্যা। এই উদ্যোগের মাধ্যমে সমাজের প্রচলিত ধারণা ও অযৌক্তিক দূরত্বের বিরুদ্ধে মানবিকতার বার্তা পৌঁছে দিতে চাইছেন আয়োজকেরা।
‘আমরা মানুষ’ নামের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে এই পুজোর মূল দর্শন। রোগের পরিচয়ে কাউকে বিচার না করে, প্রত্যেককে মানুষ হিসেবে গ্রহণ করা এবং তাঁদের পাশে দাঁড়ানোই এই উদ্যোগের বার্তা। এইচআইভি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, ভুল ধারণা দূর করা এবং আক্রান্তদের প্রতি সহমর্মী দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এমন উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
সোদপুর পূর্বপল্লীর সুবর্ণজয়ন্তীর এই আয়োজন তাই কেবল একটি দুর্গাপুজো নয়; এটি সামাজিক অন্তর্ভুক্তি, সমান অধিকার এবং মানবিক মূল্যবোধের এক প্রতীকী প্রচেষ্টা। প্রতিমা দর্শনের পাশাপাশি দর্শনার্থীদের মনে যদি এই ভাবনা জায়গা করে নেয়—তাহলেই ‘আমরা মানুষ’ ভাবনার সার্থকতা খুঁজে পাবে।
বার্তা একটাই—পরিচয় নয়, মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখুন। বৈষম্য নয়, মানবিকতাই হোক উৎসবের আসল আলো।
