Essen Durga Puja | জার্মানির এসেনে তৃতীয় বর্ষে দুর্গাপুজো, ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির মেলবন্ধনে মাতলেন প্রবাসীরা

এসেন, জার্মানি: বিদেশের মাটিতেও বাঙালির সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও শিকড়ের টান যে অমলিন, তারই পরিচয় মিলল জার্মানির এসেন শহরে। ইন্ডিয়ান কালচারাল কানেকশন এসেন ই.ভি.-এর উদ্যোগে তৃতীয় বছরে পা রাখল দুর্গাপুজোর আয়োজন। উপযুক্ত স্থান খুঁজে পাওয়ার নানা বাধা পেরিয়ে এবার একটি ক্রীড়া হলে অনুষ্ঠিত হচ্ছে এই উৎসব। সীমিত পরিকাঠামোর মধ্যেও ভক্তি, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে দেবী দুর্গার বোধন।

প্রবাসের এই দুর্গোৎসব শুধুমাত্র ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্যের বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে তোলাই এই আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ। সংগঠনের সদস্য ও স্বেচ্ছাসেবকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় উৎসবের সূচনা হয়েছে আনন্দমুখর পরিবেশে।

প্রদীপ প্রজ্বলনে উৎসবের সূচনা

এ বছরের দুর্গাপুজোর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন এসেনের স্থানীয় মেয়র জুলিয়া জ্যাকব। তাঁর প্রদীপ প্রজ্বলনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় উৎসবের আনুষ্ঠানিক পর্ব। পুজোর পাশাপাশি প্রতিদিনই থাকছে নানা ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। গান, নাচ, নাটক ও অন্যান্য পরিবেশনা দর্শকদের সামনে তুলে ধরছে শিল্প ও সৃজনশীলতার বৈচিত্র্য।

এবারের ‘নিভৃত্তি ২০২৬’-এর সাংস্কৃতিক পর্বে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে বিভিন্ন সামাজিক ভাবনা। শিশুদের অভিনীত নাটকে উঠে এসেছে বিশ্ব উষ্ণায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত সমস্যা। বড়দের নাটকেও রয়েছে চিন্তাশীল বিষয়বস্তু ও সৃজনশীল উপস্থাপনা। সব মিলিয়ে পুজোর মঞ্চ হয়ে উঠেছে আনন্দ, বিনোদন ও সচেতনতার এক সুন্দর সমন্বয়।

বাঙালি খাবারে জমে উঠেছে ভোজনপর্ব

দুর্গাপুজোর আনন্দে খাওয়াদাওয়া ও আড্ডার ভূমিকা বরাবরই বিশেষ। এসেনের এই আয়োজনেও বাঙালির চেনা স্বাদে সাজানো হয়েছে ভোজনপর্ব। গরম লুচি, ছোলার ডাল, সুজির হালুয়া, পোলাও, চিকেন কষা, আলুভাজা, ডাল এবং মাছের কালিয়ার মতো নানা পদে পরিপূর্ণ হয়েছে খাবারের তালিকা।

পুজোর আনন্দের সঙ্গে পরিচিত বাঙালি খাবারের স্বাদ প্রবাসীদের কাছে যেন ঘরের পরিবেশ ফিরিয়ে এনেছে। একসঙ্গে বসে খাওয়া, গল্প করা এবং উৎসবের মুহূর্ত ভাগ করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে আরও নিবিড় হয়েছে পারস্পরিক সম্পর্ক।

বিভিন্ন শহর থেকে মানুষের সমাগম

নর্থ রাইন-ভেস্টফালেন রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বহু মানুষ এই দুর্গোৎসবে অংশ নিতে এসেনে উপস্থিত হচ্ছেন। বখুম, কোলন, ডুসেলডর্ফ, ডর্টমুন্ড, ডুইসবুর্গ, বন, মুনস্টার ও আখেন-সহ আশপাশের বিভিন্ন শহর থেকে আগত দর্শনার্থীদের উপস্থিতিতে উৎসবের পরিবেশ আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে।

এই আয়োজনের অন্যতম বিশেষ দিক হল বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষের অংশগ্রহণ। বাঙালি সম্প্রদায়ের পাশাপাশি অন্য সংস্কৃতির মানুষও দুর্গাপুজোর আচার, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা এবং বাঙালি খাবারের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। ফলে উৎসবটি ধর্মীয় উদ্‌যাপনের গণ্ডি ছাড়িয়ে পারস্পরিক পরিচয়, বন্ধুত্ব ও সম্প্রীতির মঞ্চ হয়ে উঠেছে।

নতুন প্রজন্মের কাছে ঐতিহ্য পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ

বিদেশে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংগীত, নৃত্য ও উৎসবের ঐতিহ্য তুলে ধরতে এ ধরনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রবাসে থেকেও নিজের সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত থাকার পাশাপাশি অন্য সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতা গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হয় এই মিলনমেলার মাধ্যমে।

ইন্ডিয়ান কালচারাল কানেকশন এসেন ই.ভি.-এর তৃতীয় বর্ষের দুর্গাপুজো তাই শুধুমাত্র দেবী আরাধনার অনুষ্ঠান নয়, বরং প্রবাসী বাঙালির আবেগ, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং সামাজিক বন্ধনের এক উজ্জ্বল প্রকাশ। নানা বাধা পেরিয়ে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আয়োজিত এই উৎসব প্রমাণ করে, ভৌগোলিক দূরত্ব থাকলেও বাঙালির ঐতিহ্য ও উৎসবের আবেগ কখনও ম্লান হয় না।

মায়ের আশীর্বাদে সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও আনন্দের এই আবহ আগামী দিনেও অটুট থাকুক। প্রবাসের মাটিতে বাংলা সংস্কৃতির এই মিলনমেলা আরও বিস্তৃত হোক—এমনই প্রত্যাশা সকলের।

শুভ শারদীয়া।