দেশভাগের কাঁটাতারও মুছতে পারেনি ঐতিহ্য, সাড়ে তিনশো বছর ধরে দুর্গাপুজোয় মিলনের বার্তা ঘোষবাড়ির
সময়ের সঙ্গে বদলেছে পুজোর উদ্যাপন, বেড়েছে থিম ও আলোকসজ্জার জাঁকজমক। কিন্তু আধুনিকতার এই আবহেও ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পারিবারিক ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে বসিরহাটের ঘোষবাড়ির দুর্গাপুজো। প্রায় সাড়ে তিনশো বছরের পুরনো এই পুজো আজও বহন করে চলেছে বাংলার অতীতের স্মৃতি এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের আত্মিক বন্ধনের পরিচয়।
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী বসিরহাটের এই ঐতিহ্যবাহী পুজোকে ঘিরে রয়েছে বহু পুরনো রীতিনীতি ও আবেগ। দেশভাগের ফলে ভৌগোলিক সীমানা বদলালেও এই পরিবারের পুজোকে ঘিরে থাকা ঐতিহ্য ও শিকড়ের টান আজও অটুট। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই আয়োজনের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় অবিভক্ত বাংলার সংস্কৃতি ও সামাজিক সম্প্রীতির প্রতিচ্ছবি।
ঘোষবাড়ির পুজোর বিশেষ আকর্ষণ প্রাচীন রীতি মেনে পাঠাবলি এবং তার পরবর্তী প্রসাদ বিতরণ। উদ্যোক্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, বলির মাংস ভক্তদের মধ্যে মহাপ্রসাদ হিসেবে বিতরণ করা হয়। এই প্রথা পুজোর আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের পারিবারিক ঐতিহ্যেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
শুধু ধর্মীয় আচারেই সীমাবদ্ধ নয় ঘোষবাড়ির দুর্গোৎসব। ষষ্ঠী থেকে নবমী পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য থাকে অবারিত আতিথেয়তার ব্যবস্থা। জাতি-ধর্মের ভেদাভেদ ভুলে সকলে একসঙ্গে বসে বিনামূল্যে পুজোর ভোগ ও প্রসাদ গ্রহণ করেন। উৎসবের এই সম্মিলিত পরিবেশে ধরা পড়ে বাংলার চিরাচরিত অতিথিপরায়ণতা এবং পারস্পরিক সম্প্রীতির ছবি।
খাওয়াদাওয়ার পাশাপাশি দর্শনার্থীদের আনন্দ দিতে আয়োজন করা হয় বিনামূল্যের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। গান, নাচ ও আবৃত্তির মধ্য দিয়ে তুলে ধরা হয় বাংলার শিল্প-সংস্কৃতির নানা দিক। ফলে ঘোষবাড়ির পুজো কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং স্থানীয় মানুষের মিলনমেলা ও সাংস্কৃতিক চর্চার ক্ষেত্র হিসেবেও বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
বর্তমানে দুর্গাপুজোর আয়োজন ক্রমশ আধুনিক ও থিমনির্ভর হয়ে উঠছে। তার মধ্যেও বসিরহাটের ঘোষবাড়ি মনে করিয়ে দেয়, পুজোর প্রকৃত আকর্ষণ শুধু বাহ্যিক জাঁকজমকে নয়—তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ইতিহাস, মানুষের আন্তরিকতা এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলা ঐতিহ্যের মধ্যেও নিহিত।
সাড়ে তিনশো বছরের এই পুজো তাই আজও অতীত ও বর্তমানের মধ্যে এক সেতুবন্ধন। দেশভাগের স্মৃতি পেরিয়ে, সময়ের পরিবর্তনকে সঙ্গী করে ঘোষবাড়ির দুর্গোৎসব বয়ে নিয়ে চলেছে বাংলার শিকড়, সংস্কৃতি ও সম্প্রীতির বার্তা।
