Bhutan Lake Alert | ভুটানে ফের ভূমিধস, পাহাড়ি হ্রদ ঘিরে নতুন আশঙ্কা! উত্তরবঙ্গের নদীপাড়ে সতর্ক নজরদারি

নিজস্ব সংবাদ প্রতিবেদন

ভুটানের পাহাড়ি অঞ্চলে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা এখনও কাটেনি। কয়েক দিন আগে হিমবাহের জল জমে থাকা সিনতাফু হ্রদ থেকে বিপুল জলরাশি বেরিয়ে আসার পর এবার নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে ভূমিধসের কারণে নদীর গতিপথ আটকে গড়ে ওঠা অস্থায়ী জলাধারকে ঘিরে। এই জলাধারে জমা জলের স্থিতিশীলতা নিয়ে চিন্তায় রয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। সম্ভাব্য বিপদের কথা মাথায় রেখে ভারতের উত্তরবঙ্গের নদী তীরবর্তী এলাকাগুলিতেও সতর্ক নজর রাখা হচ্ছে।

কী ঘটেছিল ভুটানের পাহাড়ে?

গত ২৯ অক্টোবর সন্ধ্যায় ভুটানের গাসা জেলার লায়া অঞ্চলে অবস্থিত সিনতাফু হিমবাহ হ্রদে জলস্ফীতির ঘটনা ঘটে। হ্রদের জলরাশি প্রবল গতিতে নীচের দিকে নেমে আসে। জলের সঙ্গে কাদা, পাথর ও পাহাড়ি ধ্বংসাবশেষ মিশে পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।

এই জলস্রোতের প্রভাবে গাসা ছাচু এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। লায়া যাওয়ার রাস্তার একাংশ ভেঙে যায় এবং কয়েকটি সেতুর ক্ষতির খবর সামনে আসে। পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট এলাকায় মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।

নতুন করে তৈরি হয়েছে অস্থায়ী হ্রদ

প্রাথমিক বিপর্যয়ের পর আরও একটি সমস্যা দেখা দিয়েছে। পাহাড়ি নদীর সংযোগস্থলে পলি, পাথর ও ভূমিধসের উপাদান জমে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। এর ফলে তাকতসেমাখাং এলাকায় নতুন একটি অস্থায়ী জলাধার তৈরি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই প্রাকৃতিকভাবে তৈরি জলাধারের মাটির বাঁধ কোনও কারণে দুর্বল হয়ে পড়লে জমে থাকা জল ফের প্রবল বেগে নীচের দিকে নেমে আসতে পারে। তাতে দ্বিতীয় দফায় বন্যা বা আকস্মিক জলস্রোতের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

৬ নভেম্বরের সর্বশেষ পরিস্থিতি

শুক্রবার সকাল ৯টার আপডেট অনুযায়ী, ভুটানের সিনতাফুচু এলাকায় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে ন্যাশনাল সেন্টার ফর হাইড্রোলজি অ্যান্ড মেটিওরোলজি এবং ডিপার্টমেন্ট অফ জিওলজি অ্যান্ড মাইনসের যৌথ বিশেষজ্ঞ দল।

সকাল প্রায় ৮টা ২০ মিনিট নাগাদ নতুন করে ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণে এলাকায় ধসের প্রবণতা এখনও সক্রিয় রয়েছে। তবে নতুন ধসের কারণে অস্থায়ী জলাধারের বাঁধ ভেঙে বিপুল পরিমাণ জল বেরিয়ে আসার কোনও স্পষ্ট লক্ষণ মেলেনি।

জলাধারের অবস্থা, পাহাড়ের মাটির স্থায়িত্ব এবং নদীর গতিপ্রকৃতি খতিয়ে দেখছেন সংশ্লিষ্ট আধিকারিকরা।

ভারতের কোন নদীতে পড়তে পারে প্রভাব?

ভুটানের পাহাড়ি নদীগুলির জলপ্রবাহ ভারতের দিকে নেমে আসে। পুনাৎসাংছু নদী ভারতে প্রবেশের পর সংকোশ নামে পরিচিত। ফলে ভুটানের জলস্রোতের পরিবর্তন হলে সংকোশ নদীর জলস্তরেও তার প্রভাব পড়তে পারে।

বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের আলিপুরদুয়ার জেলার সংকোশ নদী সংলগ্ন এলাকা এবং অসমের ধুবড়ি অঞ্চলের উপর নজর রাখা হচ্ছে।

এর আগে কেন্দ্রীয় জল কমিশন ভুটানের হ্রদ বিপর্যয়ের পর পশ্চিমবঙ্গ ও অসমের জন্য বিশেষ বন্যা সতর্কতা জারি করেছিল। সতর্কবার্তায় বলা হয়েছিল, জলস্রোত সীমান্তে পৌঁছতে প্রায় ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা সময় লাগতে পারে। আলিপুরদুয়ার ও অসমের ধুবড়ি জেলায় জলস্তর দ্রুত বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কাও জানানো হয়েছিল।

প্রশাসনের প্রস্তুতি ও বাসিন্দাদের সতর্কতা

বিপর্যয়ের আশঙ্কায় আলিপুরদুয়ারের সংকোশ নদী সংলগ্ন এলাকায় বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং করে সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়। নদীর কাছাকাছি বসবাসকারী মানুষদের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়।

প্রশাসনিক সতর্কতার পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদেরও কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে—

১. নদীর জলস্তর হঠাৎ বেড়ে গেলে অবিলম্বে নিরাপদ স্থানে চলে যেতে হবে।

২. নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি দেখার চেষ্টা করা উচিত নয়।

৩. শিশু ও বয়স্কদের নিরাপদ জায়গায় রাখতে হবে।

৪. গবাদি পশু ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী আগেভাগে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে রাখতে হবে।

৫. প্রশাসনের নির্দেশ এবং সরকারি সতর্কবার্তার উপর নজর রাখতে হবে।

আতঙ্ক নয়, সতর্কতাই এখন প্রধান লক্ষ্য। ভুটানের পাহাড়ে ভূমিধসের পরিস্থিতি এবং অস্থায়ী জলাধারের স্থায়িত্বের উপর নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের পরবর্তী পর্যবেক্ষণ ও প্রশাসনের নতুন নির্দেশের দিকেই এখন তাকিয়ে উত্তরবঙ্গের নদী তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দারা।