বারাসাতের সেকাল-একালের কালীপুজো ও প্রাচীন মন্দিরের আখ্যান শোনাতে আজ আমরা টাইম লাইন নিউজ চ্যানেলের প্রতিবেদন নিয়ে হাজির হয়েছি দর্শকদের দরবারে।
কলকাতার দুর্গাপুজোর মতোই উত্তর ২৪ পরগনার জেলা সদর বারাসাত দীপাবলির আলোর উৎসব ও কার্তিকী অমাবস্যার কালীপুজোর জন্য গোটা রাজ্যে আজ অত্যন্ত জনপ্রিয়। দেশভাগের পর ওপার বাংলা থেকে আসা ছিন্নমূল মানুষদের ঘরোয়া আরাধনা থেকে পরবর্তী কালে ১৯৫৬ সালে ক্রীড়াপ্রেমী মহাদেব সেনের হাত ধরে ‘রেজিমেন্ট’-এর মাধ্যমে এই শহরে বারোয়ারি পুজোর সূত্রপাত ঘটে। সেখান থেকেই আজ কোটি টাকার থিম ও বিশ্বমানের আলোর মহোৎসবে পরিণত হয়েছে বারাসাত।
বারাসাতের কালীপুজোকে ঘরোয়া আঙিনা থেকে বর্ণালী ক্লাব এবং রেজিমেন্টের যুগলবন্দিতে লাইমলাইটে আসা থেকে পরবর্তী সময়ে কেএনসি রেজিমেন্টের রাজকীয় উত্থানের ইতিহাস সত্যিই রোমাঞ্চকর।
১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে বারাসাতের পুজোকে প্রথম বারোয়ারি বা সামাজিক রূপ দেয় মূলত এই দুটি ক্লাব ‘বর্ণালী’ এবং রেজিমেন্ট। ১৯৫৬ সালে ক্রীড়াপ্রেমী মহাদেব সেনের উদ্যোগে যখন ‘শক্তির আরাধনায় রেজিমেন্ট’-এর বিশাল পুজোর শুরু, তখন থেকেই ক্রমে লাইমলাইটে আসতে শুরু করে বারাসাতের কালীপুজো। এই দুটি সংগঠনের পুজোয় আলোকসজ্জার প্রতিযোগিতা সেই সময়ে বালার মানুষের নজর কেড়ে নেয়। এই দুটি ক্লাবের সমানে সমানে টক্কর দেওয়ার মানসিকতাই বারাসাতের সাধারণ পুজোকে প্রথম সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে নিয়ে আসে। বহিরাগত দর্শনার্থীদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠার সেই শুরু বারাসাতের কালীপুজোর।
এরপর কেএনসি রেজিমেন্টের রাজকীয় উত্থান ঘটে আধুনিক থিমের উপস্থাপনের মাধ্যমে। ১৯৬০ সালে পথ চলা শুরু করে বারাসাতের পুজোর সংজ্ঞাই বদলে দেয় কেএনসি রেজিমেন্ট।আলোকসজ্জার গণ্ডি পেরিয়ে মণ্ডপে শৈল্পিক ছোঁয়া ও বিশালাকার প্রতিমার মেলবন্ধন ঘটায় এই ক্লাব সংগঠন। আশির দশকের পর থেকে কলকাতার বড় বড় দুর্গাপুজোর থিমমেকারদের বারাসাতে প্রথম নিয়ে আসে তারাই। বাংলাদেশের জমিদার বাড়ি, যোধপুরের উমেদ প্যালেস কিংবা তুষারাবৃত কৈলাসের মতো তাক লাগানো থিম উপহার দিয়ে কেএনসি রেজিমেন্ট আজ শুধু বারাসাত নয়, গোটা পশ্চিমবঙ্গের কালীপুজোর অন্যতম সেরা ক্রাউড পুলার হয়ে উঠেছে।
মূলত বর্ণালী ও রেজিমেন্টের বোনা প্রতিযোগিতার বীজ থেকেই আজকের কেএনসি রেজিমেন্টের রাজকীয় উত্থান।
পাশাপাশি বারাসাতের কালীপুজোকে যারা রাজ্যজোড়া খ্যাতি এনে দিয়েছে তাদের মধ্যে অগ্রগণ্য পাইওনিয়ার অ্যাথলেটিক ক্লাব, নবপল্লী অ্যাসোসিয়েশন বা সন্ধানী ছাড়াও দর্শনার্থী সমাগমে টেক্কা দেয় শতদল সংঘ, বিদ্রোহী, তরুছায়া, আমরা সবাই, আগুয়ান সংঘ, ঐতিহ্যশালী এবং এগারো হাত উচ্চতার প্রতিমার বিশেষত্ব নিয়ে নবপল্লী ব্যায়াম সমিতি-সহ আরও বেশ কিছু অগ্রণী যুব সংগঠন।
ঐতিহ্য ও আধুনিক থিমের যুগলবন্দিই বারাসাতের কালীপুজোর আসল আকর্ষণ।
এর পাশাপাশি আজ আমরা শোনাব গা-ছমছমে ইতিহাসের চলমান বৈশিষ্ট্যের ধারক ও বাহক কয়েকটি শতাব্দীপ্রাচীন জাগ্রত মন্দিরের উপাখ্যান।
বারাসাত ও তার আশপাশের অঞ্চলের অতিপ্রাচীন কিছু মন্দিরে আজও মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে ইতিহাস ও অলৌকিক বিশ্বাসের উপাদান।
মধ্যমগ্রামের বাদু রোডে ৫০০ বছরের প্রাচীন রঘু ডাকাতের কালীবাড়ি যার অন্যতম। কাজিপাড়ার কাছে অবস্থিত এই প্রাচীন জনপদটি একসময় গভীর জঙ্গলে ঘেরা ছিল। লোকশ্রুতি অনুযায়ী, কুখ্যাত রঘু ডাকাত ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে এই মন্দিরের মায়ের কাছে মানত করত। আরও চমকপ্রদ তথ্য হল, এখানে কোনও প্রথাগত মূর্তি বা পুরোহিত নেই। ভাঙা ইট আর প্রাচীন অশ্বত্থগাছের নীচে ভক্তেরা শক্তির আরাধনা করেন।
বারাসাতের নোয়াপাড়ার জাগ্রত কালীমন্দিরে মায়ের শান্ত ও করুণাময়ী রূপের পুজো হয়। লোকমুখে প্রচলিত, মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের আমলে এই মন্দিরটির প্রতিষ্ঠা এবং পুজোর শুরু।
বারাসাত সংলগ্ন আমডাঙার করুণাময়ী কালীমন্দিরটিও ৪৫০ বছরেরও বেশি পুরনো। মুঘল সম্রাট আকবরের সময়কালে গড়ে ওঠা এই মন্দিরের দোতলায় রয়েছে মা করুণাময়ীর বিগ্রহ, যা প্রাচীন বাংলার তান্ত্রিক ও কাপালিক ইতিহাসের অনন্য সাক্ষী।
উনিশ শতকের শুরুতে জঙ্গলঘেরা বারাসাত ব্যারাকপুর রোডের পুরনো অঞ্চলে একটি বটগাছের নিচে কৃষ্ণবর্ণ শিলাখণ্ড পাওয়া নিয়ে কথিত যে, সেই শিলাটির সংস্পর্শে অলৌকিক রক্তক্ষরণ ঘটতে দেখে স্থানীয় মানুষ শিলাখণ্ডটিকে দৈবী শক্তিজ্ঞানে পুজো শুরু করেন। আজ সেই কালীবাড়িটি একটি সমৃদ্ধ মন্দিরে রূপান্তরিত।
যশোর রোড হাইওয়ের লরিচালক এবং স্থানীয় শ্রমিকদের হাত ধরে প্রায় ৮ দশক আগে শুরু হওয়া বড় মা বা বড় কালীর মন্দির বারাসাত শহরের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থিত অন্যতম জাগ্রত ক্ষেত্র হিসেবে আজ গোটা রাজ্যের মানুষের কাছে মান্যতা পেয়েছে। কার্তিকী কালীপুজোর রাতে এই মন্দিরের মায়ের কাছে মানত করে অসংখ্য ভক্ত আজও দণ্ডি কেটে পুজো দেন।
বাঙালির আলোর এই মহোৎসবে বারাসাতে আধুনিক থিমের চাকচিক্য যেমন চোখ ধাঁধিয়ে দেয়, তেমনই এই সব প্রাচীন মন্দিরকে ঘিরে থাকা অলৌকিক ইতিহাস বারাসাতের কালীপুজোয় যোগ করেছে গভীর আধ্যাত্মিক মাত্রা।
